নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা। নাম থেকেই অনুমান করা যায় যে এর সাথে নারীবাদী বিশেষত এনজিওগোষ্ঠী এবং বাম সংগঠনগুলোর যোগসূত্র রয়েছে। আর এনজিওগোষ্ঠীর যোগসূত্র থাকলে সেখানে দেশ-ধর্ম-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বিরোধী বিদেশী এজেন্ডা থাকবে না, সেটা তো হতে পারে না। এনজিওগোষ্ঠী কিন্তু কখনোই আপনাকে সরাসরি বিষ খেতে দেবে না, তারা এক গ্লাস দুধের মধ্যে এক চামচ বিষ মিশিয়ে দেবে। ফলে এই মৈত্রী যাত্রার অনেক বিষয় এমন থাকতেই পারে যেটা আসলেই যৌক্তিক দাবী। কিন্তু এটা কখনো সম্ভব না যে দশটা দাবির মধ্যে একটাতেও দেশ-ধর্ম-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বিরোধী কিছু থাকবে না।
এক.
মৈত্রী যাত্রার পেছনে কারা?

মৈত্রী যাত্রার আহ্বান, এর প্রতি সংহতি জ্ঞাপন ও এই প্রোগ্রামের উপস্থিতি থেকে বুঝা যায় যে এই আয়োজনের পেছনে রয়েছেঃ
- সরকার ঘনিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
- বাম সংগঠন ও
- এনজিও গোষ্ঠী যাদের ছত্রছায়ায় রয়েছে
- নারীবাদী সংগঠন
- উপজাতি সংগঠন
- এলজিবিটি গোষ্ঠী ও
- বেশ্যা সম্প্রদায়
১.১ মৈত্রী যাত্রায় সরকার-ঘনিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্তি

১. ড. সামিনা লুৎফা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন সমন্বয় কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন, গণদাবীর প্রেক্ষিতে যে কমিটি বাতিল করা হয়। শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাকে এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান আয়োজক বলে ধারণা করা যায়।
২. শিরিন পারভিন হক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান। প্রতিষ্ঠাতা, নারীপক্ষ।
৩. গীতিআরা নাসরিন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য। শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
৪. ড. ইফতেখারুজ্জামান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান। নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
১.২ মৈত্রী যাত্রায় বাম নেতা ও সংগঠনের সম্পৃক্তি

বাম নেতৃবৃন্দের মধ্যে মৈত্রী যাত্রায় উপস্থিত ছিলেনঃ

১. জোনায়েদ সাকি। প্রধান সমন্বয়কারী, গণসংহতি আন্দোলন
২. রুহিন হোসেন প্রিন্স। সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি
১.৩ মৈত্রী যাত্রায় এলজিবিটি ও সমকামী গোষ্ঠীর সম্পৃক্তি

মৈত্রী যাত্রায় উপস্থিত হতে দেখা যায় পরিচিত ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী এক্টিভিস্টদের
১. জয়া সিকদার। ট্রান্স নারী (নারীর রূপধারী পুরুষ)
২. হোচিমিন ইসলাম। ট্রান্স নারী (নারীর রূপধারী পুরুষ)
৩. মোস্তাফিজুর রহমান প্রত্যয়। ট্রান্স নারী (নারীর রূপধারী পুরুষ)
৪. এনসিপির বহিস্কৃত নেতা মুনতাসির রহমান। গে (পুরুষ সমকামী) এক্টিভিস্ট।
১.৩.১ এলজিবিটি গোষ্ঠীর আওয়ামী সম্পৃক্তি

হোচিমিনের আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সাথে সুসম্পর্ক ছিল, জুলাই বিপ্লবের সময় সে ফেসবুকে বিপ্লবের বিপক্ষে পোস্ট দেয়- যা পরে মুছে ফেলেছে।

মোস্তাফিজুর রহমান প্রত্যয় ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং আওয়ামী লীগের পতনের পরও তাকে আওয়ামী লীগের পক্ষে নিয়মিত প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।
১.৪ মৈত্রী যাত্রায় উপজাতীয় সংগঠনের সম্পৃক্তি

১.৫ মৈত্রী যাত্রায় সংহতি ও সমর্থনে আরো যারা আছেন
১.৫.১ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বাঁচাও আন্দোলনঃ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ও বর্তমান কিছু শিক্ষকমন্ডলীঃ

- ১. মাহমুদুল সুমন। শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
- ২. মির্জা তাসলিমা সুলাতানা। শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
- ৩. পারভীন জলী। সাবেক শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ট্রেজারার, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়।
- ৪. মাহা মির্জা। খণ্ডকালীন শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
১.৫.২ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

সংহতি জানায় Anthro-Socio Club, IUB.
শিক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনঃ
নাজনীন শিফা, ফ্যাকাল্টি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
১.৫.৩

- ১. ডেভিড বার্গম্যান। ব্রিটিশ মানবাধিকার কর্মী। ড. কামাল হোসেনের মেয়ে সারা হোসেনের স্বামী।
- ২. তাসনিম খলিল। সাংবাধিক। প্রধান সম্পাদক, নেত্র নিউজ।
- ৩. আশরাফ কায়সার। সাংবাদিক।
১.৫.৪

- ১. নওশাবা আহমেদ। অভিনয়শিল্পী।
- ২. ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান। সঙ্গীতশিল্পী।
১.৫.৫

- ১. রেহনুমা আহমেদ। নারী অধিকার কর্মী।
- ২. মারজিয়া প্রভা। নারীবাদী ও নারী অধিকারকর্মী। উল্লেখ্য, গাঁজা পার্টিতে এক তরুণীকে ছাত্রফ্রন্টের ২ নেতা কর্তৃক ধর্ষণে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে মারজিয়া প্রভার বিরুদ্ধে।
১.৫.৬

এনসিপি নেত্রী তাসনুভা জাবীন।
দুই.
মৈত্রী যাত্রার নেপথ্যে এনজিও এজেন্ডা

নারী অধিকারের আড়ালে মৈত্রী যাত্রার নেপথ্য এজেন্ডা যা ছিল বলে প্রতীয়মান হয়ঃ
- ১. দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা ধ্বংস করা
- ২. ইসলাম-বিদ্বেষ বৃদ্ধি করা
- ৩. পারিবারিক কাঠামো বিনষ্ট করা
- ৪. মূল্যবোধের অবক্ষয় সাধন
২.১ দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা ধ্বংস করা
বাংলাদেশের সংবিধান উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, এবং বাস্তবিকই তারা কোনভাবেই আদিবাসী নয়। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশের অখন্ডতা ধ্বংস করে আলাদা ভূখন্ডের দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্য উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রয়োজন পার্বত্য অঞ্চল হতে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়া যেন বিচ্ছিন্নবাদী গ্রুপগুলো আরো সক্রিয় ও সংগঠিত হবার সুযোগ পায়। এই দুটো দাবীই আমরা মৈত্রী যাত্রার নামে উচ্চারিত হতে দেখতে পাইঃ
২.১.১ উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দাবি

২.১.২ পার্বত্য অঞ্চল হতে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি

- দাবি: পাহাড় থেকে সেনাশাসন হটাও
- দাবি: পাহাড়ে বহিরাগত অনুপ্রবেশ বন্ধ কর। (পাহাড় কি ভিন্ন রাষ্ট্র যে সেখানে একই রাষ্ট্রের অন্য এলাকার নাগরিক প্রবেশ করতে পারবে না?)

ঘোষণাঃ পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে ‘যুদ্ধবাজ সিকিউরিটি পলিসি’ হিসেবে অভিহিত করে অমান্য করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
২.২ পর্দা ও ইসলামী আইনের অবমাননা করে ইসলাম-বিদ্বেষ বৃদ্ধি করা
সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের অংশ কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত যা কোন মুসলিমের জন্য অমান্য করার সুযোগ নেই। ইসলামে সম্পত্তির উত্তরাধিকারকে অনায্য দাবি করে ‘মৈত্রী যাত্রা’ থেকে আইন করে ইসলামী আইনের বিপরীতে নারী-পুরুষকে সমান অংশ দেবার দাবি জানানো হয়। সব ধর্মের মানুষের জন্য অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন (ইউনিফর্ম সিভিল কোড) প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামী বিধানকে নারী-বিদ্বেষী হিসেবে প্রচারণার মাধ্যমে নারীদেরকে ইসলাম-বিদ্বেষী করে তোলা। এছাড়াও ওড়নাকে নেতিবাচক বিষয় হিসেবে প্রকাশ করে এবং নেকাবী নারীকে ‘গে এঞ্জেল’ হিসেবে প্রদর্শন করে একইসাথে পর্দা ও ইসলামকে অবমাননা করা হয়।
২.২.১ ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বাদ দিয়ে ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালুর দাবি

২.২.২ ওড়নাকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন

২.২.৩ নেকাবী নারী দিয়ে সমকামিতার সিম্বলের প্রদর্শনী

২.৩ পারিবারিক কাঠামো বিনষ্ট করা
২.৩.১ পারিবারিক কলহ উস্কে দেওয়া

আল্লাহ তায়ালা সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতে পুরুষকে নারীর ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন এবং নারীর ভরণপোষণের দায়িত্বও পুরুষের ওপর অর্পণ করেছেন। হাদিসেও পুরুষকে পরিবারের দায়িত্বশীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন:
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব ইমাম, যিনি জনগণের দায়িত্বশীল তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার, সন্তান-সন্ততির উপর দায়িত্বশীল, সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কোন ব্যাক্তির দাস স্বীয় মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব জেনে রাখ, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৬৫৩ (ই.ফা.)]
কাজেই কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে মুসলিম পরিবার মাত্রই পিতৃতান্ত্রিক পরিবার। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক পরিবার তো অবাধ যৌনতার পথে বাধা। অবাধ যৌনতার জন্য প্রয়োজন এমন পরিবার যেখানে পিতৃপরিচয়ের কোন আবশ্যকতা থাকে না, যেখানে স্ত্রীকে শাসনের কেউ থাকবে না, পুত্র-কন্যাকে শাসনের কেউ থাকবে না। কাজেই মৈত্রীযাত্রার অন্যতম শ্লোগান হচ্ছে “চলো পিতৃতন্ত্র পিষি”। এভাবে পিতৃতন্ত্র পেষার শ্লোগান শিখিয়ে পরিবারিক কলহ ও বিবাহ-বিচ্ছেদ বৃদ্ধির মাধ্যমে পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করা মৈত্রীযাত্রার অন্যতম নেপথ্য এজেন্ডা।
২.৩.২ বৈবাহিক সম্পর্ককে কলঙ্কিত করা
মৈত্রীযাত্রা একদিকে বেশ্যাদের যৌনকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করে তার সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাকুল, অন্যদিকে বৈবাহিক সম্পর্ককে কলঙ্কিত করতে সচেষ্ট। তারা প্রচার করতে চায়, বিয়ে মানেই সম্মতি নয়, প্রতিবার মিলিত হবার আগে অনুমতি নিতে হবে, নাহলে সেটা হবে ‘বৈবাহিক ধর্ষণ!’।
২.৩.২.১ বিয়ে মানেই সম্মতি নয় বলে প্রচারণা

২.৩.২.২ ‘বৈবাহিক ধর্ষণ!’ নামক উদ্ভট ধারণার প্রচার ও তার ভিত্তিতে শাস্তি দাবি

২.৪ মূল্যবোধের অবক্ষয় সাধন
২.৪.১ পতিতাবৃত্তি তথা অবাধ যৌনতার প্রসার
২.৪.১.১ বেশ্যাবৃত্তিকে স্বাভাবিকীকরণের অপচেষ্টা

২.৪.১.২ বেশ্যাদের ‘যৌনকর্মী’ হিসাবে স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা দাবি

২.৪.২ এলজিবিটি তথা সমকামী অধিকার (!) প্রতিষ্ঠার প্রচারণা
২.৪.২.১ ট্রান্সনারী তথা নারীরূপ ধারণকারী পুরুষদের বিতর্ক ছাড়া নারী হিসেবে মেনে নেওয়ার দাবি

২.৪.২.২ সমকামী সিম্বল গে এঞ্জেলের প্রদর্শনী

২.৪.২.৩ এলজিবিটি প্রমোট ও স্বীকৃতি দাবি

২.৪.২.৫ নানাবিধ এলজিবিটি প্রচারণা

শেষের কথাঃ

মৈত্রী যাত্রার আড়ালে দেশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ-বিরোধী এনজিও এজেন্ডা আশা করি এতক্ষণে সকলের নিকট পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু ধর্ম ও মূল্যবোধ-বিরোধী এনজিও এজেন্ডার পক্ষে এরকম একটা আয়োজনে ব্র্যাকের সম্পৃক্ততা না থাকলে তো হিসাব মেলে না। তবে, চাঁদা কালেকশনে যখন নগদ, রকেট ইত্যাদি বাদ দিয়ে একমাত্র ‘বিকাশ’কেই বেছে নেওয়া হয় হিসাবটা সহজেই মিলে যায়।






