| | | |

আমরা কেন বিএনপির রেইনবো নেশন নিয়ে শঙ্কিত?

এক.

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষকই ছিলেন না, স্বাধীন বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করে এই রাষ্ট্রটিকে একটি ইসলামী চরিত্র প্রদানের ক্ষেত্রেও তার অবদান অনস্বীকার্য।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দুইটি যুগান্তকারী সংশোধনী আনেনঃ

  • ১. সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত করেন যা এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে।
  • ২. সংবিধানের মূলনীতি থেকে “ধর্মনিরপেক্ষতা’ কে বাদ দিয়ে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস”-কে  অন্তর্ভুক্ত করেন, যা ইসলামের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের ভাবনাকে প্রতিফলিত করে।

২০১১ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস”-কে সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে “ধর্মনিরপেক্ষতা’-কে পুনঃস্থাপন করার আগ পর্যন্ত ৩১ বছর ধরে এদেশের জনগন এই মূলনীতির সুফল পেয়ে এসেছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে জিয়াউর রহমান সংবিধানিকভাবে ইসলামী মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করার যে বিপ্লবী পথে হেঁটেছিলেন, বর্তমানের বিএনপি সেই পথ থেকে অনেকটাই সরে এসেছে, এমন কি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ মূলনীতিকে সংবিধানে ফিরিয়ে আনার সুস্পষ্ট কোন ঘোষণা বিএনপির রাষ্ট্রসংস্কারের ৩১ দফাতে নেই যদিও মৌখিকভাবে কেউ কেউ এই মূলনীতিকে ফিরিয়ে আনার দাবী জানিয়েছেন।

দুই.

জিয়ার ১৯ দফা বনাম বিএনপির সাম্প্রতিক ৩১ দফাঃ

জিয়ার ১৯ দফার সাথে বিএনপি-র ৩১ দফায় মোটা দাগে কয়েকটি পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়ঃ

 জিয়ার ১৯ দফাবি এন পি ৩১ দফা
ইসলামী ভাবধারা বিশ্বাসজিয়ার ১৯ দফায় ইসলামী ভাবধারা ও বিশ্বাস উপস্থিত ছিল।   ২য় ধারায় বলা হয়েছিলঃ শাসন তন্ত্রের চারটি মূলনীতি অর্থ্যাৎ সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্নক বিশ্বাস আস্থা, গনতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনে সর্বাত্নক প্রতীফলন।বি এন পি-র ৩১ দফায় ইসলামী ভাবধারা সম্পূর্ণ রূপে অনুপস্থিত।   সংবিধান সংস্কার করার কথা বলা হলেও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার কোন উল্লেখ অনুপস্থিত
উম্মাহবোধজিয়ার ১৯ ধারায় উম্মাহবোধ উপস্থিত ছিল।   ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছিলঃ সকল বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশ গুলোর সাথে সম্পর্ক জোড়দার করা।  বি এন পি-র ৩১ দফায় উম্মাহবোধ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত
ইসলামী মূল্যবোধজিয়ার ১৯ দফায় ইসলামী মূল্যবোধ পরিপন্থী কোন বিষয় অনুপস্থিত ছিল।বি এন পি-র ৩১ দফায় রেইনবো নেশন  এর নামে অন্তর্ভুক্তিমূলকজাতি গঠনের ঘোষণায় LGBTQ+ তথা সমকামী গোষ্ঠীর স্বীকৃতির মাধ্যমে সমকামিতার সামাজিকীকরণ ও স্বাভাবিকীকরণের আশঙ্কা রয়েছে।

তিন.

অন্তর্ভুক্তিমূলক রেইনবো নেশনঃ

.

রংধনু দেখতে যতই ভালো লাগুক না কেন, রেইনবো সিম্বল এখন আর সাদামাটা কোন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি এখন বিকৃতকামী LGBTQ+ গোষ্ঠীর প্রতীক। রেইনবো নেশন নামে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি কোম্পনিও রয়েছে যারা LGBTQ+তথা সমকামীদের নিয়ে কাজ করে।

.

বিএনপি অবশ্য সাউথ আফ্রিকা মডেলের রেইনবো নেশনের কথা বলছে। কিন্তু সাউথ আফ্রিকায় রেইনবো নেশনের পরিণতি এবং ক্রমধারাও আমাদের শঙ্কিত করে তুলেঃ 

১৯৯৪ সালনেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন এবং তিনিও দেশটির বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি, এবং ধর্মের বৈচিত্র্য উদযাপন করার লক্ষ্যে “রেইনবো নেশন” ধারণাকে সমর্থন করেন।  
১৯৯৬ সালদক্ষিণ আফ্রিকা তার নতুন সংবিধানে লিঙ্গ এবং যৌন অভিমুখিতা (সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন) এর ভিত্তিতে বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করে। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সংবিধান যেখানে এই ধরনের সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  
২০০৬ সালদক্ষিণ আফ্রিকা আফ্রিকার প্রথম দেশ এবং বিশ্বে পঞ্চম দেশ হিসেবে সমকামী বিবাহকে বৈধতা দেয়। এর মাধ্যমে LGBTQ তথা সমকামী ব্যক্তিরা আইনি স্বীকৃতি পায়।

.

অনেকেই মনে করতে পারেন আমরা শুধু শুধুই ‘রেইনবো নেশন’-এর সাথে সমকামী মুভমেন্টের সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করছি। কিন্তু বিবিসির সাংবাদিকরাও যখন একই প্রশ্ন তোলেন তখন আমাদের এই আশংকাকে অমূলক ধারণা করার আর কোন সুযোগ থাকে না।

বিবিসির সাংবাদিকরা যখন বিএনপির রেইনবো নেশনের সাথে সমকামী মুভমেন্টের সম্পর্ক আছে কি-না এই বিষয়ে প্রশ্ন তুললেন বিএনপির পক্ষ থেকে সরাসরি অস্বীকার না করে ক্ষেত্র প্রস্তুতের অজুহাত তুলে ধরা হয়

এ ব্যাপারের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “ আপনি সবই কিন্তু একবারে করতে পারবেন এমন কোনো কথা নাই সেটা করার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করারও একটা ব্যাপার আছে বাংলাদেশের যে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অবস্থান মানুষের চিন্তা-চেতনা সেটাকে মাথায় রাখতে হবে। ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি গণতন্ত্র যখন বলেন তখনতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের গুরুত্ব দেয়াটাই হচ্ছে গণতন্ত্র। তা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সমকামীদের অধিকার যেটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে সেটা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত কী”?

https://www.bbc.com/bengali/articles/cj590v37e9yo

.

বিএনপির LGBTQ+ তথা সমকামী  সাপোর্টের বিষয়ে সন্ধিগ্ধ করে তোলার আরেকটি কারণ হচ্ছে ছাত্রদলের কমিটিতে জেন্ডার নায্যতা ও সমতা বিষয়ক সম্পাদকের পদ থাকা, কেননা জেন্ডার নায্যতা ও সমতা বলতে এখন আর কেবল নারী-পুরুষের সমতাকে বুঝানো হয় না বরং ট্রান্সজেন্ডার তথা সমকামী গোষ্ঠীকেও সমতার আওতাভুক্ত করা হয়ে থাকে।

.

অন্তর্ভুক্তিমূলক বা Inclusive শব্দটা শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু আমরা জানি এই শব্দ দিয়েই কালচারাল সাম্রাজ্যবাদীরা দেশে দেশে সমকামিকাকে বৈধ করে চলেছে। যতকিছুই অন্তর্ভুক্ত করা হোক না কেন কোন দেশ, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, উন্নয়ন, গণতন্ত্র কোন কিছুকেই পশ্চিমা মানদণ্ডে ১০০% ইনক্লুসিভ হিসেবে গণ্য করা হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সমকামী গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত না করা হবে। কাজেই বিএনপির অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতির ধারণা যৌক্তিক কারণেই আমাদেরকে বিচলিত করে।

ইলন মাস্ক বলেছেনঃ  “DEI must DIE” [উল্লেখ্য DEI: Diversity, equity, and inclusion] , আর ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প তো DEI এর বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ শুরু করেছেন, এরপরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বা Inclusive শব্দ নিয়ে যে আমরা অনর্থক বিচলিত হই না সেটা না বুঝার আর কোন কারণ থাকতে পারে না।

শেষের কথাঃ

সাম্প্রতিককালে বিএনপির কর্মকান্ড দেখে মনে হচ্ছে বিএনপির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা বাম ও সেক্যুলার একটি চক্র বিএনপিকে ইসলামী ভাবধারা থেকে বের করে সেক্যুলার ভাবধারার দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং ইসলামপ্রেমিক জনগোষ্ঠীর থেকে বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন করে বিএনপিকে দিয়ে আওয়ামী শূন্যতা পূরণে আপ্রাণ চেষ্টায় রত।

বিএনপিকে ভুলে গেলে চলবে না যে এই সংগঠনের গোড়া হচ্ছে জিয়াউর রহমানের ইসলামী মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও আগ্রাসনবিরোধী নীতি। জিয়ার এই আদর্শ থেকে বিএনপিকে বিচ্যুত করার চক্রান্তকে যদি নস্যাত করা না যায় বিএনপিও যেমন ব্যাপক জনসমর্থন হারাবে, দেশও তেমনি এক গভীর সংকটে নিপতিত হবে। বিএনপি-র নেতৃস্থানীয়রা এই বিষয়টি যত দ্রুত বুঝবেন দেশ ও দলের জন্য ততই মঙ্গল।

প্রাসঙ্গিক লেখাসমূহ

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *