সমকামিতা নিয়ে রাখাল রাহার ফেসবুক পোস্ট

সমকামিতা বিষয়ে রাখাল রাখার ফেসবুক পোস্ট হুবুহু কপি করে নিচে দেওয়া হলো:

(পোস্টের লিঙ্ক: https://www.facebook.com/share/F5PRt24uUMyajTCo/)

কাম-সমকাম / রাখাল রাহা
.
ছোটবেলায় আমি নাকি দেখতে বেশ সুন্দর নাদুশনুদুশ ছিলাম। আমার দিকে বড় বয়সের কিছু ছেলে ভিন্নচোখে তাকাতো বুঝতে পারতাম। দু-একজন ভিন্নভাবে আদর করতে চাইতো, সরে যেতাম। এটা এমন একটা বিষয় কাউকে বলতেও পারতাম না। অভিজ্ঞতা হয়নি, কিন্তু শিকার হতে পারতাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক বন্ধু একদিন তার অভিজ্ঞতার গল্প বলেছিল। এক বিয়ের অনুষ্ঠানে তার চেয়ে বয়সে বড়ো একজন লোক খাতির করে তাকে কাছে নিয়ে শুয়ে ক্রমাগত উত্তেজিত করে তার প্রবৃত্তিকে পরাজিত হতে বাধ্য করেছিল। হলের এক বড়ো ভাই তাদের অঞ্চল চট্টগ্রাম-নোয়াখালীতে এই প্রবণতার আধিক্য উল্লেখ করে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। ক্যাডেট কলেজের এক বন্ধু তাদের পরিবার-বিচ্ছিন্ন থাকার মানসিক কষ্ট এবং কিশোর বয়সে বড়ো ভাইদের নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল। কিছুদিন আগে ফেসবুকের এক বন্ধু তার কওমী মাদ্রাসা জীবনের করুণ অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন। আরেক বন্ধু তার দেখা মাদ্রাসাজীবনের ভয়াবহ কাহিনী একদিন অনেকক্ষণ ধরে শোনালেন। আর জেলজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদেরই একজন গল্পকার ব্যতিক্রমী একটি গল্প লিখেছেন।

আমাদের এই অভিজ্ঞতাগুলোর সবই সমকাম-কেন্দ্রিক। এর কিছু প্রাকৃতিক, কিছু বিকৃতিক।

এটা তো সত্য যে প্রাণী হিসাবে মানুষের বেঁচে থাকার ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রথমে প্রয়োজন শ্বাস-প্রশ্বাসের, এরপর খাবার-দাবারের, এরপর কামের। এর মধ্যে প্রয়োজনের তীব্রতা যেটাতে সবচেয়ে বেশী সেটাতে নিয়ম-কানুন ও বিধি-নিষেধ সবচেয়ে কম। যেমন দুনিয়ার কোথাও কেউ বলবে না যে, অমুক সময়ে নিঃশ্বাস নিলে বা অমুক স্থানে নিঃশ্বাস নিলে আপনাকে শাস্তি পেতে হবে।

এরপর যেটার প্রয়োজন খাবার, সেখানে কিছু বিধিনিষেধ মানুষ তৈরী করেছে। যেমন বলেছে, অমুক বস্তু খেও না, অমুক বস্তু পান ক’রো না, এবং এর সাথে পাপ-পুণ্য-শাস্তি ইত্যাদির বিধান জুড়ে দিয়েছে।

একেবারে শেষে যেটা কাম, অর্থাৎ প্রয়োজনের তীব্রতা যেখানে অপর দুটোর চেয়ে কম, তাকে নিয়ে বিধি-নিষেধ সবচেয়ে বেশী এবং এগুলোকে প্রায় অলঙ্ঘ্যনীয়, অমার্জনীয় ও অপরিবর্তনীয় করে তোলা হয়েছে। এমনকি সমাজ-রাষ্ট্রভেদে এর ব্যত্যয় ঘটলে অমানবিক বিচারপ্রক্রিয়ায় ফেলে বা না-ফেলে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর রেওয়াজও পৃথিবীতে এখনো চালু আছে। আর এই বিচারপ্রক্রিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সর্বক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু বিপরীতকামীরা।

পৃথিবীতে বহুকাল থেকেই প্রজাতি হিসাবে মানুষের এই তিনটি প্রধান প্রয়োজন নিয়ে সংযম-নিয়ন্ত্রণের সাধনা যেমন আছে, তেমনি এটাকে অসীম ভোগাকাক্সক্ষায় রূপান্তরের বিকৃতিও আছে। দম নিয়ন্ত্রণ করে আত্মার উপলব্ধির মাধ্যমে স্রষ্টার সান্নিধ্যলাভের চেষ্টা এ ভূভাগের মুণিঋষিরা বহুকাল ধরে করেছেন, এখনো করছেন। খাদ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মার সংযম-সাধনা তো দুনিয়া জুড়ে এখনও বহুল প্রচলিত বিষয়। একইভাবে কামসংযম বা ব্রহ্মচর্চার মাধ্যমে কাম-জয়ের সাধনা বা কামকে প্রেমে রূপান্তরিত করার স্বর্গীয় সাধনা-ধারা, সেও বহু পুরাতন।

অন্যদিকে কে কত-কত খাবার কত বেশী খেতে পারে, কত-কত ভাবে কতক্ষণ ধরে কামে উন্মত্ত হতে পারে তার প্রলোভন-আয়োজনও বহুকাল ধরে আছে, এবং দিন দিন তা বেড়ে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ইহজগতে যতো ভোগাকাঙ্ক্ষা পূরণে সে অক্ষম, পরজগতে সেই উদগ্র বাসনার পূর্তিতে সকল সক্ষমতা দেখিয়ে তা পাবার নিশ্চয়তাও সেট করেছে।

কিন্তু ইহজগতে অধিকাংশ মানুষ সংযম করুক বা না-করুক, যেন স্বাভাবিকতায় থাকে তার জন্য বিভিন্ন সমাজ-রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরণের আইন-কানুন-রীতিনীতি আছে; আছে নানা ধরণের কাম নিবারণের প্রথাপদ্ধতি—বিবাহ যার মধ্যে একটা। যেসব দেশে অর্থকড়ি বা পুঁজিই সমাজের মূল নিয়ন্ত্রক, সেখানে বিবাহ-বহির্ভুত কাম নিবারণের জন্য নানা ধরণের প্রতিষ্ঠানও আছে। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাও সেইসব দেশের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এখান থেকে কাম নিবারণের প্রতিষ্ঠানগুলো, বলা যায়, একপ্রকার তুলে দেওয়া হয়েছে, বা এটাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তোলা হয়েছে।

এখন সমাজের উচ্চবিত্তরা সহজেই অর্থ দিয়ে কাম নিবারণ করতে পারে। তাদের সন্তানেরাও ক্রমশ প্রচলিত কাম-বিষয়ক মূল্যবোধ পরিত্যাগ করছে। আর একেবারেই বিত্তহীন বা রাস্তা ও বস্তির মানুষের কাম বিষয়ে কোনো মূল্যবোধ রক্ষা করা কখনোই সম্ভব ছিল না। যে কিশোর-কিশোরী রাস্তায় বা বস্তিতে শুয়ে সৎ-পিতা বা সৎ-ভাই দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে সেখানে, কিংবা ফাইভ ষ্টার হোটেল বা প্রাসাদোপম অট্টালিকায় যে কামচর্চা হচ্ছে সেখানে ধর্মের নিয়ন্ত্রণ নেই, মাথাব্যথাও নেই। আইনও সেটা উপেক্ষা করছে বা সমর্থন করছে।

এর বাইরে যারা থাকে—সেই সমাজের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত, যাদের থাকে বহু ধরণের মূল্যবোধ—তারা এবং তাদের সন্তানেরা কাম অবদমনের শিকার সবচেয়ে বেশী। ধর্ম বা আইন এখানেই থাকে তার প্রবল উপস্থিতি নিয়ে। উল্লেখ্য যে, ধর্ম বা আইন প্রায় সকল ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরুর কাম-পদ্ধতির তারে বাঁধা থাকে, এবং তার সর্বজনীনতা বিষয়ে সে থাকে অনমনীয়।

প্রকৃতিতে বিপরীতকামীরাই সংখ্যাগুরু। সংখ্যাগুরু সবসময় সংখ্যালঘুর আচার-বিশ্বাস-রীতি-মূল্যবোধ-তাড়না-প্রবৃত্তিকে কোনো-না-কোনো মাত্রায় অস্বাভাবিক বা অন্যায় বা পাপকর্ম বলে বিবেচনা করে থাকে। কামের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু সংখ্যালঘু কাম-সম্প্রদায়ের মানুষেরা আমাদের চারপাশেই আছে। তারা দেখতে আমাদেরই মতো, আমাদেরই মতো মানবিক চাহিদা আবেগ-অনুভূতি নিয়ে তারা বেঁচে থাকতে চায়।

কিন্তু সংখ্যালঘুজ কাম বা সমকামের প্রকারভেদ আছে—প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল এবং বিকৃতিক বা পারভার্টেড। ন্যাচারাল কেন হয় তার ব্যাখ্যা জীববিজ্ঞানী বা প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা দেন, ডাক্তাররাও জানেন, বাকীটা মালিক জানেন। কিন্তু বিপরীতকামীরাও পারভার্টেড সমকামী হতে পারে অবদমনে, বাধ্য হয়ে, বিকৃতিতে বা পরিবেশ-পরিস্থিতিতে। আমাদের জেলখানায়, কওমী মাদ্রাসায়, ক্যাডেট কলেজ বা এ ধরণের প্রতিষ্ঠান বা পরিবেশে পারভার্টেড সমকামের কম-বেশী চর্চা আছে।

সারা জগতেই এ ধরণের পারভারশন আছে কম-বেশী। বিকৃত-বিকারগ্রস্ত বা অবদমনপীড়িত বিপরীতকামীরাই মূলত সমাজে ধর্ষণ ঘটায়। মানবিক, স্বাভাবিক ও সুস্থ সমাজ-পরিবেশ নির্মাণের সাথে এই পারভার্শন থাকা-না-থাকা বা কম-বেশী হওয়ার সম্পর্ক। কিন্তু কোনটা পারভার্শন আর কোনটা ন্যাচারাল এই দুটো বুঝতে আমরা অনেক সময় ভুল করে থাকি।

ইসলাম ধর্ম বিষয়ে প্রজ্ঞাবান একজন মানুষের সাথে কোরাণের অনুবাদ সম্পাদনার কাজ করতে গিয়ে আলোচনাপ্রসঙ্গে তাঁর মত জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, কোরাণে কাম-পারভার্শনকে মহাপাপ বলা হয়েছে এবং এ ধরণের পারভার্শনে কিছু জাতির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে প্রবৃত্তি একটা মানুষ স্বাভাবিকভাবে পেয়েছে তার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। সুতরাং প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত যে কাম, তার রূপ যেমনই হোক, এ থেকে তাকে বঞ্চিত করা মানে জুলুম করা।

আমি নিজে যতটুকু পড়েছি তাঁর মত সমর্থনযোগ্য মনে হয়েছে। কাম সহজাত, এবং স্বাভাবিক-কামের বৈচিত্র্য আছে। স্বাভাবিক বিপরীতকামীরা জগতে সংখ্যাগুরু, আর স্বাভাবিক সমকামীরা সংখ্যালঘু বা অতি সংখ্যালঘু। সত্য হচ্ছে সংখ্যাগুরুরা নানা কারণে বিকৃত-সমকামে পৌঁছেও এটাকে তারা বিকৃতি হিসাবেই ভাবে। তাদের দিক থেকে ভাবনাটা ঠিক আছে। কিন্তু সেই ভাবনাটাই তারা সংখ্যালঘুর স্বাভাবিক কাম বা সমকামের উপর প্রয়োগ করে যখন সিদ্ধান্ত টানে, ভুলটা তখনই ঘটে। যে কাম স্রষ্টা নির্ধারণ করছেন এবং যা সৃষ্টির শুরু থেকেই আছে তা বিকৃত হলে স্রষ্টা দায়ী হয়ে পড়েন। এ বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতগণ ভালো বলতে পারেন।

এই যে সংখ্যালঘু কামসম্প্রদায়ের মানুষ, তাদের নিয়ে আমাদের একজন লেখক একটি উপন্যাস লিখেছিলেন বেশ ক’বছর আগে। কিন্তু বাংলাদেশে এদের যে একটি সংগঠন আছে এবং তাদের ‘রূপবান’ নামের একটি পত্রিকা আছে এটা জানার সুযোগ হয় বছর খানেক আগে তাদের লেখালেখি সম্পাদনার বিষয়ে একটি কর্মশালা করতে গিয়ে।

এর আগে আমি বিজ্ঞান বিষয়ের লেখকদের লেখালেখি সম্পাদনা বিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করেছি, ভাষা প্রশিক্ষণার্থীদের লেখালেখি সম্পাদনা বিষয়ে কর্মশালা করেছি, গবেষকদের লেখালেখি সম্পাদনা বিষয়ে কর্মশালা করেছি, আর ধর্ম (বিশেষ করে ইসলাম) বিষয়ের লেখকেরা সম্পাদনার নিয়মিত কর্মশালায় সবসময়ই থেকেছেন। কিন্তু সেই কর্মশালাটা ছিল আমার জন্য ব্যতিক্রমী এক অভিজ্ঞতা। তাদের লেখালেখি সম্পর্কে সেই প্রথম আমার জানার সুযোগ হয়। এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বায়োসেক্স, ট্রান্সজেণ্ডার) এই অ্যাব্রেভিয়েশনটাও সেই সুবাদে আমি প্রথম জানতে পারি। তারা তাদের সম্পর্ককে বলে ‘সমপ্রেম’; তারা ধর্ষক নয়, প্রেমিক; বিকৃতিক নয়, প্রাকৃতিক। ‘রূপবান’ থেকে বেশ কয়েকজন অংশগ্রহণ করেছিল। আমার মনে নেই তাদের নাম-চেহারা। তাদের একজনকে হত্যা করা হয়েছিল। হয়তো যাকে হত্যা করা হয়েছিল তিনিও ছিলেন সেই কর্মশালায়। কি নির্মমতা!

কাম মূলত পরমানন্দময় সৃষ্টির তাগিদে। কিন্তু জগতের সহস্রভাগের একভাগ কামও সৃষ্টির তাগিদে চরিতার্থ হয় না। এটাই স্বাভাবিক। আর সংখ্যাগুরুর গায়ের জোর, তার বিকৃতি ও মনোস্তত্ত্বের সাথে জগতের সকল সংখ্যালঘুর সকল বিষয়ের সংকটের সম্পর্ক রয়েছে—কামেরও। আর এর সাথে যখন ধূর্ত শাসকের ধুরন্ধর পরিকল্পনা জড়িয়ে যায় তখন সংকট জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। সবার কল্যাণ হোক। (রাখাল রাহা, এপ্রিল ২০১৬, পরিমার্জিত মার্চ ২০২২)

প্রাসঙ্গিক লেখাসমূহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *