|

ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অফিস নিয়ে বিশ্লেষণ

ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অফিস নিয়ে ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে বর্তমানে জাতিসংঘ কিভাবে কাজ করছে?

বর্তমানে বাংলাদেশে জাতিসংঘের UNDP, WFP, UN Women, FAO সহ বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এসব সংস্থার অফিস বাংলাদেশে রয়েছে। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, যেমন: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ইত্যাদি। এছাড়াও, অনেক সময় ব্র্যাক ও রেড ক্রিসেন্টসহ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওর সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। জাতিসংঘের সকল কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করে UN Resident Coordinator’s Office (UN Country Office)।

কিন্তু এখনো পর্যন্ত জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা অর্থাৎ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় বা (OHCHR)-এর কোনো দেশীয় কার্যালয় বাংলাদেশে স্থাপন করা হয়নি।

তবে গতকাল ১০ জুলাই ২০২৫ বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের ৩৩তম বৈঠকে ঢাকায় তিন বছরের জন্য OHCHR-এর অফিস স্থাপনের বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। (প্রথম আলো- ১০ জুলাই ২০২৫)

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কান্ট্রি অফিস বা দেশীয় কার্যালয় কি?

OHCHR (Office of the High Commissioner for Human Rights) হলো জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সর্বোচ্চ সংস্থা। যখন সংস্থাটি কোনো দেশে স্থায়ীভাবে একটি অফিস স্থাপন করে, সেটিকে “দেশীয় কার্যালয় (Country Office)” বলা হয়, যা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কর্মকাণ্ড ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়ে থাকে।

তবে এই কার্যালয়ের মেয়াদ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তি, সময় ও প্রেক্ষাপটের উপর, যা পরিবর্তনশীল হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নেপালে ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সালের গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে OHCHR একটি কার্যালয় স্থাপন করেছিল। কিন্তু গৃহযুদ্ধের অবসান এবং গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর ২০১১ সালে নেপাল সরকার ওই অফিসের চুক্তি নবায়ন না করায় তা বন্ধ হয়ে যায়।

তবে নেপাল ব্যতীত অন্য কোনো দেশে OHCHR-এর দেশীয় কার্যালয় একবার স্থাপনের পর তা আর সরানো হয়নি।

ঢাকায় মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়টি ৩ বছরের জন্য হবে?

ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের (OHCHR) কার্যালয়টি প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য স্থাপন করা হবে। মেয়াদ শেষে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এটির মেয়াদ নবায়নের সুযোগ রয়েছে। উপদেষ্টা আসিফ নজরুল (কালের কণ্ঠ, ২৯ জুন ২০২৫)।

তবে বাস্তবতা হলো, এই কার্যালয়টি ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী কাঠামোতে রূপ নিতে পারে। কারণ, OHCHR সাধারণত দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত হয়, এবং অনেক সময় এসব সংস্থা নিজস্ব নীতি ও এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অফিসকে ব্যবহার করে থাকে। কোনো দেশ যদি সেই এজেন্ডার বিরোধিতা করে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। দাতা সংস্থাগুলোর স্বার্থ যদি পূরণ না হয়, তবে বাংলাদেশের পক্ষে তাদের সঙ্গে সমতায় চলা কঠিন হয়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের জন্য এই কার্যালয় বন্ধ করা বা সরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগতভাবে দুরূহ হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় স্থাপনের যৌক্তিকতা আছে কি?

  • অফিস না খুলেও মানবাধিকার কমিশন কাজ করতে পারে। তার প্রমাণ হচ্ছে এই কমিশন জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ১৩ ফ্রেব্রুয়ারী ২০২৫। তাহলে কেন তারা অফিস খুলতে আগ্রহী? কারন মানবাধিকার কমিশনের নিজস্ব ফান্ডিং নেই। অফিস স্থাপন করতে পারলে তারা পশ্চিমা দাতা সংস্থা থেকে ফান্ডিং জোগার করতে পারবে। এতে তাদের নিজস্ব লোকবল, রিসোর্স সংস্থান হবে যার মাধ্যমে বড় পরিসরে মানবাধিকার লংঘনের বিষয়গুলো তথ্য-উপাত্ত তৈরী করতে পারবে। উল্লেখ যে, পশ্চিমা দাতা সংস্থা ফান্ডিং করে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে যেখানে এলজিবিটি, নারীবাদসহ বিভিন্ন ইস্যু জড়িত।
  • জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের (OHCHR) দেশীয় কার্যালয় সাধারণত যুদ্ধ, সংঘাত বা জাতিগত বিরোধপূর্ণ দেশগুলোতে স্থাপন করা হয়। তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে এই অফিস রয়েছে যেমন: বুরকিনা ফাসো, চাড, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, সুদান, গিনি, লাইবেরিয়া, কলম্বিয়া, হন্ডুরাস প্রভৃতি দেশ। যার সবগুলোতেই যুদ্ধ, গৃহবিভাজন, বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মতো সংকট রয়েছে। বাংলাদেশে এমন কোন সংকট নাই।
  • এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন কিংবা লেবাননে OHCHR কার্যালয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর (উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, সিরিয়া) ওপর নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হয়। সেক্ষেত্রে আশঙ্কা রয়েছে, বাংলাদেশে কার্যালয় স্থাপন করা হলে সেটি মিয়ানমারের ওপর নজরদারির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশের কি দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন, বা লেবাননের মতো প্রতিবেশীকে মোকাবেলার কূটনৈতিক প্রস্তুতি বা সক্ষমতা আছে?
  • দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশেই OHCHR-এর দেশীয় কার্যালয় নেই; এমনকি অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশও এ ধরনের অফিস স্থাপনে সম্মতি দেয়নি। তাহলে বাংলাদেশে এই কার্যালয়ের অফিস খোলার প্রয়োজনিয়তা কি?
  • নেপালে ১৯৯৬-২০০৬ সালের গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে কার্যালয় খোলা হয়; পরে অবস্থা স্বাভাবিক হলে ২০১১ সালে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তো এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

ঢাকায় মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপনের পিছনে যুক্তি:

ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের (OHCHR) কার্যালয় স্থাপনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, এই কার্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সরাসরি তদন্ত করা সম্ভব হবে। এতে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সুরক্ষায় OHCHR কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

তবে বাস্তবতা হল, জাতিসংঘ অনেক সময় মানবাধিকার ইস্যুতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং তাদের অবস্থান বহুক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশের স্বার্থ রক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থেকেছে। এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো-২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে সংঘটিত গনহত্যার বিষয়ে এখনো পর্যন্ত OHCHR-এর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, যা তাদের ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অতএব, এ ধরনের কার্যালয়ের কার্যকারিতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ ও বিতর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় খুললে দেশ যে সমস্ত সংকটের মুখোমুখি হতে পারে:

  • ইসলামি শরিয়াহ ও পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ করার আশঙ্কা রয়েছে, যা ধর্মীয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
  • মানবাধিকারের নামে বারবার সমকামিতা, কাদিয়ানি, নারী স্বাধিনতা ইত্যাদি ইস্যু তৈরি করে দেশে অস্থিতিশিল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
  • পশ্চিমা মানবাধিকার মডেল চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে, যা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
  • জাতীয় সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করতে পারে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে বিদেশি প্রভাব বাড়াতে পারে।
  • সংখ্যালঘু ইস্যু বারবার তুলে ধরার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার আশঙ্কা রয়েছে।
  • জাতিসংঘের দাতা সদস্যগুালো (অর্থাৎ পশ্চিমা দেশগুলো) বাংলাদেশে তাদের স্বার্থ বাস্তবায়নে মানবাধিকারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

যেসব দেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় আছে:

ওএইচসিআর এর ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওএইচসিআর সদরদপ্তর। এবং বিশ্বের ১৬টি দেশে সংস্থাটির কার্যালয় রয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে- বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, চাড, কলোম্বিয়া, গুয়াতেমালা, গিনি, হুন্ডুরাস, লাইবেরিয়া, মৌরিতানিয়া, মেক্সিকো, নাইজার, ফিলিস্তিন, সিরিয়া (লেবাননের বৈরুত থেকে পরিচালিত), সুদান, টিউনিশিয়া এবং ইয়েমেন। এছাড়াও, দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি ফিল্ড অফিস এবং ইউক্রেনে একটি মিশন অফিস রয়েছে সংস্থাটির।

এর বাইরেও ১৩টি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে ওএইচসিআর এর। এর মধ্যে ব্যাংককে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় অবস্থিত। তবে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে সংস্থাটির কার্যালয় নেই, কোনো আঞ্চলিক দপ্তরও নেই। ইউরোপ বা উত্তর অ্যামেরিকার কোনো দেশেও দেশটির কার্যালয় নেই।

অন্যান্য দেশে তাদের অসাধু কার্যক্রম:

  • গাজায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় (OHCHR) থাকলেও ইসরায়েলের ভয়াবহ গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তারা কেবল উদ্বেগ প্রকাশের বাইরে কোনো উল্লেখযোগ্য বা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এতে OHCHR-এর নিরপেক্ষতা ও বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
  • কলম্বিয়ায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় (OHCHR) কলম্বিয়ায় সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমকে একতরফাভাবে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করে এবং বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী FARC-এর গুরুতর অপরাধকে লঘু করে দেখায় বলে কঠোর অভিযোগ রয়েছে। (The Associated Press (AP), 21 February 2020)
  • গুয়াতেমালায় জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কমিশন CICIG শুরুতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিলেও পরে এর কর্মকাণ্ডকে “বিচারিক অভ্যুত্থান (Judicial Coup)” ও জাতীয় সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এতে দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। (The New York Times, August 31, 2018)
  • বুরুন্ডি সরকার ২০১৬ সালে দেশ থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের বহিষ্কার করে, কারণ তাদের প্রতিবেদনে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। এটি সরকারের সাথে জাতিসংঘের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায়। (“Burundi bars UN human rights investigators” Al Jazeera- October 11, 2016)

এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনেক সময় নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলে এবং কিছু বিশেষ রাজনৈতিক বা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে। বাংলাদেশের মতো একটি শান্তিপূর্ণ ও সার্বভৌম দেশেও এই ধরণের কার্যলয় স্থাপনের ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

প্রাসঙ্গিক লেখাসমূহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *