ভূমিকা
প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এতদিন বাস্তবে তা কার্যকরী ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিলে বিষয়টি সকলের নজর কাড়ে। সমালোচনার মুখে সরকার সংগীত শিক্ষক নিয়োগকে স্থগিত করলেও বাম ও সেকুলার কিছু সংগঠন এই স্থগিতের বিরুদ্ধে আবার দৌড়ঝাপ শুরু করেছে। “সংগীত” এর সংজ্ঞা না জেনেই মুসলিম নামধারী কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকেও ‘সংগীত শিক্ষক’ এর পক্ষে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে। মূল আলোচনায় যাবার আগে আমাদের দুটি বিষয় বুঝতে হবে। প্রথমত, ‘সংগীত’ আর ‘গান’ এক কথা নয়। দ্বিতীয়ত, সংগীত বিষয়টি প্রাথমিকে এখনও অপূর্ণাঙ্গরূপে রয়েছে, সম্ভবত শিক্ষক নিয়োগ দেবার পর ধীরে ধীরে এই বিষয়টিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেবার একটা প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।
এক.
প্রাথমিকে সংগীতের অন্তর্ভুক্তি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ
১.১
সংগীত কি শুধুই গান?
অনেকেই সংগীত বলতে কেবল গানকেই বুঝে থাকেন। আসলে কিন্তু তা নয়। গান, বাদ্য এবং নৃত্য এই তিনের সমন্বয়কে সংগীত বলা হয়।
সংগীত = গীত (গান) + বাদ্য (বাজনা) + নৃত্য (নাচ)
এটা আমার বানানো কোন সংজ্ঞা নয়। পঞ্চম শ্রেণীর সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকার ৪ নম্বর পৃষ্ঠাতেই সংগীতের সংজ্ঞা দেওয়া আছে। নিচে দেখুনঃ

১.২
সংগীত বইতে কি বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষাও আছে?
পঞ্চম শ্রেণীয় সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকায় আমরা দেখতে পাই সেখানে নিচের বাদ্যযন্ত্রগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছেঃ
- ১. মন্দিরা
- ২. তানপুরা
- ৩. সেতার
- ৪. বেহালা
- ৫. সারিন্দা
- ৬. ঢোল

চিত্রঃ পঞ্চম শ্রেণীর সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকা, পৃষ্ঠা-২০

চিত্রঃ পঞ্চম শ্রেণীর সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকা, পৃষ্ঠা-২১

চিত্রঃ পঞ্চম শ্রেণীর সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকা, পৃষ্ঠা-২২

চিত্রঃ পঞ্চম শ্রেণীর সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকা, পৃষ্ঠা-২৩

চিত্রঃ পঞ্চম শ্রেণীর সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকা, পৃষ্ঠা-২৪

চিত্রঃ পঞ্চম শ্রেণীর সংগীত বিষয়ের শিক্ষক সহায়িকা, পৃষ্ঠা-২৫
১.৩
হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিতে সংগীত তথা- নৃত্য, গীত ও বাদ্য
১.৩.১
হিন্দুদের বিভিন্ন মাঙ্গলিক ও প্রাত্যহিক অনুষ্ঠান এবং সঙ্কেতজ্ঞাপনে বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। যেমন;
- পূজা-পার্বনেঃ শঙ্খ, ঢোল, কাঁসর
- বিবাহেঃ সানাই, শঙ্খ, ঢোল, কাঁসর
- সন্ধ্যারতিতেঃ শাঁখ ও ঘন্টা
- বর ও বধূবরণেঃ শঙ্খ (ও উলুধ্বনি)
- নবজাতকের আবির্ভাবেঃ শঙ্খ (ও উলুধ্বনি)
১.৩.২
হিন্দু দেবতাদের মূর্তিতেও বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যেমন;
- বিষ্ণু -> শঙ্খধারী
- শিব -> ডমরুধারী
- কৃষ্ণ -> মুরলীধারী
- স্বরস্বতী -> বীণাধারিণী
বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে সরস্বতী ‘বীণাপাণি’ এবং কৃষ্ণ ‘মুরলীধর’ নামে পরিচিত।
১.৩.৩
চৌদ্দ শতকের বৈষ্ণবকাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ রয়েছ। যেমন;
- মুরলী বা মোহনবাঁশি
- করতাল
- মৃদঙ্গ
কৃষ্ণের নাচের তালবাদ্য বলা হয়েছে নিচের বাদ্যযন্ত্র দুটোকেঃ
- করতাল
- মৃদঙ্গ
ষোলো শতকে চৈতন্যদেবের প্রবর্তনায় কীর্তন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যার প্রধান বাদ্যযন্ত্র ছিলঃ
- খোল
- করতাল
- মন্দিরা
[সূত্রঃ বাংলাপিডিয়া (বাদ্যযন্ত্র)]
১.৩.৪
পৌরাণিক যুগে, বাল্মীকি প্রণীত ‘রামায়ণ’-এর পৌরাণিক চরিত্র অপ্সরাগণ নৃত্য পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ধারণা করা হয়, রাম এবং রাবণ উভয়ই নৃত্যে পারদর্শী ছিলেন। তবে রামায়ণে ‘নাটক’ এবং ‘নৃত্য’কে পৃথক করে দেখা হতো। ব্যাসবেদ সংকলিত ‘মহাভারত’-এ উল্লেখ্য ঘৃতাচি, মেনকা, রম্ভা, স্বয়ম্প্রভা, উর্বশী এবং মিশ্রকেশী ছিলেন অপ্সরা। তাদের ছিল নর্তনশালা। উক্ত গ্রন্থে আরও আলোচিত হয়েছে গায়ক, নৃত্যশিল্পী, বাদক, স্ত্ততি, দেবদুন্দুভি, শঙ্খ, বীণা, বেণু, মৃদঙ্গ, তাল ও লয় প্রসঙ্গ।
[সূত্রঃ বাংলাপিডিয়া (নৃত্যকলা)]
১.৪
ইসলামে সংগীত তথা গান, বাদ্য ও নৃত্য
ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধ পরিপন্থী কোন কথা না থাকার শর্তে বাদ্যবাজনামুক্ত গানের সুযোগ ইসলামে থাকলেও একমাত্র দফ (নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও সময়ে) ছাড়া অন্য যে কোন বাদ্যবাজনা ইসলামে একবারেই নিষিদ্ধ।
১.৪.১ কুরআন হতে প্রাপ্ত তথ্য
কুরআনের আয়াতের অর্থ
কতক মানুষ আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার উদ্দেশে অজ্ঞতাবশতঃ অবান্তর কথাবার্তা (لَهوَ الحَدِيث) ক্রয় করে আর আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ওদের জন্যই আছে অবমাননাকর শাস্তি। [সূরা লুকমান, আয়াত নং ৬]
- আলোচ্য আয়াতে لَهْوَ الْحَدِيْثِ এর অর্থ ও তাফসীর কি, এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের উক্তি বিভিন্ন রূপ। হযরত ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস ও জাবের (রা)-এর এক রেওয়ায়েতে এর তাফসীর করা হয়েছে গানবাদ্য করা। (হাকেম, বায়হাকী)
- অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও তাফসীরবিদের মতে গান, বাদ্যযন্ত্র ও অনর্থক কিস্সা কাহিনীসহ যেসব বস্তু মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে গাফিল করে সেগুলো সবই لَهْوَ الْحَدِيْثِ – বুখারী ও বায়হাকী স্ব-স্ব কিতাবে لَهْوَ الْحَدِيْثِ এর এ তাফসীরই অবলম্বন করেছেন।
[দ্রষ্টব্য়ঃ মাআ’রেফুল কুরআন, সূরা লুকমানের ৬ নং আয়াতের তাফসির]
১.৪.২ হাদিস হতে প্রাপ্ত তথ্য
এখানে কিছু হাদিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে যাতে প্রতীয়মান হবে ইসলামে গান, বাদ্য, নৃত্য কতটুকু অনুমোদিত। মূল হাদিসের রেফারেন্স দ্রষ্টব্যে দেওয়া হয়েছে।
১.৪.২.১
আল্লাহতায়ালা এই উম্মতের একটি দলের একাংশের ওপর পর্বত ধ্বসিয়ে দিবেন, আর অবশিষ্ট লোকদের তিনি কিয়ামত দিবস পর্যন্ত বানর ও শুকর বানিয়ে রাখবেন। তাদের অপরাধের মধ্যে একটি অপরাধ এই হবে যে তারা বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। [দ্রষ্টব্যঃ সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫১৮৯ (ই.ফা.)]
১.৪.২.২
এই উম্মতের কিছু লোককে মাটিতে ধ্বসানো হবে, তাদের ওপর পাথর বর্ষণ করা হবে এবং তাদের আকার বিকৃত করে দেওয়া হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে। [দ্রষ্টব্যঃ সহীহুল জামে’, হাদিস নং ৫৪৬৭, হাদিসের মানঃ সহিহ]
১.৪.২.৩
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঢোল বা তবলা বাজাতে নিষেধ করেছেন। [দ্রষ্টব্য়ঃ সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৬৪৪ (ই. ফা.), হাদিসের মানঃ সহিহ]
১.৫
বিশ্লেষণ
ওপরের আলোচনা হতে এটা পরিষ্কার যে ৯১% মুসলিম অধ্যুষিত দেশে প্রাথমিকে সংগীত বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি কেবল বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনই নয়, বরং ৭-৮% হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে জোর করে ৯১% মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেবার নামান্তর, যা এদেশে হিন্দুয়ানি তথা ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অপচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ। এই ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টার পেছনে কারা ইন্ধন যোগাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।
দুই.
প্রাথমিকে সংগীতের অন্তর্ভুক্তি মৌলিক শিক্ষা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র
২.১
মৌলিক বিষয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের দক্ষতা
দ্য সাউথ এশিয়ান অ্যাসেসমেন্ট অ্যালায়েন্স কমিউনিকেটিং অ্যান্ড কোলাবোরেটিং ফর চেঞ্জ (ইওএল) প্রকল্পের মাধ্যমে ওয়েভ ফাউন্ডেশন খুলনা ও রাজশাহী জেলায় ৮৮টি গ্রামের ৭১টি বিদ্যালয়ে এবং ১৭৬০টি পরিবারের ১৫৩৩জন শিশুর ওপর সিটিজেন লেড অ্যাসেসমেন্ট নামক জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ে দক্ষতার অভাব প্রকটভাবে ফুটে ওঠৈ।
[সূত্রঃ বাংলা, ইংরেজি, গণিতে পিছিয়ে প্রাথমিকের ৮০ শতাংশ শিশু: জরিপ]

চিত্রঃ ওয়েব ফাউন্ডেশনের জরিপের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে মৌলিক শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ শিক্ষার্থীদের হার
২.২
মৌলিক বিষয়ে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের দক্ষতা

চিত্রঃ ২০১১ ও ২০২২ সালে ৩য় ও ৫ম শ্রেণীর কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জনকারী শিক্ষার্থীর হার
[সূত্রঃ সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও নেমে গেছে প্রাথমিক শিক্ষার মান]
শেষ কথাঃ
যেখানে প্রাথমিকে বাংলা, ইংরেজি, গণিতের মত মৌলিক বিষয়েই শিক্ষার্থীদের অবস্থা শোচনীয় সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৯১%) মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে সংগীতকে প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার এক গভীর চক্রান্তের অংশ।







ইসলামকে ক্ষতিগ্রস্ত বাম /ইসলাম বিদ্বেষীদের চক্রান্ত
আমাদের বাচ্চাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার শিক্ষা দিতে এবং শিশুমনে মানবিকতার বিকাশে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।গনিতের,বিজ্ঞান ও ইংরেজীর পাশাপাশি সমহারে ধর্মীয় শিক্ষায় আমাদের আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলার জন্য হলেও প্রাথমিকে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।